সর্বশেষ সংবাদ

রাশিয়া–কাতারে বিশ্বকাপ হবে হবে কী ?





দুই যুগ ধরে চলে আসা দুর্নীতি কি ব্ল্যাটারের অগোচরে হয়েছে? ফিফা সভাপতির মাথায় এখন চিন্তার ভাঁজ। ছবি: রয়টার্স‘ফিফায় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার কাণ্ডের পর ২০১৮, ২০২২ বিশ্বকাপ কি রাশিয়া, কাতার থেকে সরানো হবে?’ এই প্রশ্ন দিয়ে গতকাল সংবাদ শিরোনাম করেছে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে এফবিআইয়ের তদন্তের পর বেরিয়ে এসেছে ফিফায় ঘুষ ও দুর্নীতির মহা মহা সব কেলেঙ্কারির খবর। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নির্দেশে ১৪ জন প্রভাবশালী কর্মকর্তা (৯ জন ফিফার, বাকি ৫ জন বিভিন্ন ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের) গ্রেপ্তার হওয়ার পর এবার​ সুইস কর্তৃপক্ষ আলাদা করে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ নিয়ে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। এতেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত রাশিয়া আর কাতারে বিশ্বকাপ হবে কি না।
ফিফার সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস’-এর সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তের পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডের ‘অফিস অব দি অ্যাটর্নি জেনারেল’ও (ওএজি) আলাদা করে তদন্ত করছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ রাশিয়া ও কাতারকে বরাদ্দ করার পেছনে আর্থিক দুর্নীতি, ঘুষ ও অর্থপাচারের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। গতকালই ফিফার সদর দপ্তর থেকে এ সংশ্লিষ্ট একাধিক কাগজপত্র ও দলিল জব্দ করা হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন আর আবেগের কেন্দ্রে থাকা ফুটবল থেকে দুর্নীতির শেকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল লরেটা লিঞ্চ। ১৯৯১ সাল থেকে ২৪ বছর ধরে চলে আসা ফিফার সব দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত করছে এফবিআই। এই সময়টায় ফিফার বেশ কয়েক জন কর্মকর্তা ১৫ কোটি ডলারেরও বেশি ঘুষ খেয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যেটি প্রায় ১ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। অবৈধ এই টাকাগুলোর বড় অংশ হংকং, কেম্যান দ্বীপ ও সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত আছে বলে জানানো হয়েছে।
খেলা সম্প্রচার, বিপণন, বাণিজ্যিক অংশীদার, টুর্নামেন্ট বরাদ্দসহ বিভিন্ন খাতে এই দুর্নীতিগুলো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অঙ্কের দুর্নীতি হয়েছে টুর্নামেন্ট বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের কর বিষয়ক সংস্থার অপরাধ বিষয়ক দপ্তরের প্রধান রিচার্ড ওয়েবার ফিফা কর্মকর্তাদের এই দুর্নীতিকে বলেছেন ‘জালিয়াতির বিশ্বকাপ’। বলেছেন, ‘আমরা আজ তাদের সরাসরি লাল কার্ড দেখালাম।’ আর লিঞ্চ বলেছেন, ‘দুই প্রজন্মের ফুটবল কর্তারা তাঁদের নিজ নিজ ক্ষমতা অপব্যবহার করে ফুটবল টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব ঘুষের বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন। এটা তাঁরা বারবার করেছেন, বছরের পর বছর। টুর্নামেন্টের পর টুর্নামেন্ট।’
২০১০ বিশ্বকাপ প্রথমবারের মতো আফ্রিকা মহাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যে বিশ্বকাপ আয়োজনকে বলা হচ্ছিল গর্বের, সেটিতেও কালিমা লেগেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, সেবার বিশ্বকাপ আয়োজনের ভার পেতে দক্ষিণ আফ্রিকা ফিফার কয়েকজন কর্মকর্তাকে ১ কোটি ডলার ঘুষ দিয়েছিল। মোট তিনটি ভোটের বিনিময়ে এই পরিমাণ ঘুষ বিনিময় করা হয়, যেটির সুবিধা ভোগ করেছেন তখনকার ফিফা সহসভাপতি জ্যাক ওয়ার্নার।
রাশিয়া এবং কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের ভার একইভাবে বরাদ্দ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের ভার পাওয়া নিয়ে অনেক আগে থেকেই নানা রকম কানাঘুঁষা চলছিল। এখন প্রশ্ন উঠেছে, সামনের দুটো বিশ্বকাপের ভাগ্যে তাহলে কী ঘটতে চলেছে? দুর্নীতির অভিযোগে মামলা চলবে। মামলার রায় নিষ্পত্তি হতে সময়ও লাগবে। এরই মধ্যে কি রাশিয়া ও কাতার থেকে বিশ্বকাপ দুটো সরিয়ে ফেলা হবে? নাকি অপেক্ষা করা হবে চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত? কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে রায় ঘোষিত হওয়ার পর অপরাধ প্রমাণিত হলে অন্তত রাশিয়া থেকে বিশ্বকাপ কি সরানো সম্ভব হবে?
বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞ আয়োজনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হয় স্বাগতিক দেশটিকে। স্টেডিয়াম, আবাসন ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হয় কোটি পর্যটকের জন্য। ২০১৬ সালে রাশিয়ায় বিশ্বকাপের মহড়া টুর্নামেন্ট কনফেডারেশনস কাপ হওয়ার কথা। রাশিয়া-কাতারের বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ​ নিয়ে লিঞ্চ কোনো মন্তব্য করেননি। শুধু বলেছেন, ‘ফিফাকে অনেকগুলো আত্মজিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।’

ফিফার যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালক ওয়াল্টার ডি গ্রেগরিও অবশ্য জোর দিয়েই বলছেন, ‘২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ রাশিয়া আর কাতারেই হবে।’ ফিফার নিজেরই নৈতিক জোর যেখানে দুর্বল হয়ে পড়ছে, সেখানে এই সিদ্ধান্তে সংস্থাটি অটল থাকতে পারে কি না, সেটাই দেখার। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত কাতার বিশ্বকাপ সরে যেতে পারে। সেটির আয়োজনের ভার যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। অথবা নতুন করে আবারও ‘বিড’ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য সে দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও বেশির ভাগ অভিযুক্ত কর্মকর্তাই যুক্তরাষ্ট্রে যেতে নারাজ। বিশেষ ক্ষমতাবলে গ্রেপ্তার করে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হতে পারে। পুরো প্রক্রিয়ায় ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার কতটা জড়িত, তাঁকে প্রশ্নের মুখোমুখি করা হবে কি না, এ বিষয়টিও এখনো সুস্পষ্ট নয়।
ফিফা সভাপতি পদে নির্বাচনের ঠিক দুদিন আগে ফুটবল বিশ্ব তোলপাড় করে দেওয়া এই ঘটনা ঘটল। ১৯৯৮ সাল থেকে ফিফা প্রধানের পদে থাকা ব্ল্যাটার আরেক মেয়াদে নির্বাচিত হবেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জর্ডানের প্রিন্স আলী বিন আল হুসেইন। ফিফা সভাপতির নির্বাচন নিয়েও এখন ঘোর অনিশ্চয়তা। সূত্র: এএফপি, রয়টার্স।


No comments:

Post a Comment

Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.