সর্বশেষ সংবাদ

ফিরতে চেয়েও হয় না ফেরা

Do-not-even-go-back

 

ওপারে মেঘলা পৃথিবী, এপারে বিক্ষিপ্ত মন আর ক্লান্ত দেহ। এই শহরে যান্ত্রিক শব্দের সঙ্গে মাখামাখি। মুঠো ফোনের যে চিৎকারে দিনের শুরু হয় তার শেষ বলে কিছু থাকে না। পুরোটাই প্রবাহের মতো। শুরুটা আর শেষটা বোঝার উপায় নেই। ছুটতে ছুটতে হারিয়ে ফেলি নিজের শিকড়। মাঝে মাঝে ভাবতে বসি আকাশ-পাতাল, ছাইপাশ। তখন পুরো জগতটাই হয়ে ওঠে আমাদের ভাবনার ঘর। কিন্তু সেই ঘর থেকে বাস্তবে ফিরে আসলেই দেখি আমরা আর আমাদের মধ্যে নেই। হয়ে উঠি আমরা অন্য মানুষ।


প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব একটি জায়গা থাকে। সেই জায়গা থেকে বের হয়ে গিয়ে আমরা মাঝে মধ্যেই হারিয়ে যেতে চাই। বা অনেকে হারিয়েই যাই। কিন্তু সেই হারানো থেকে তো ফিরে আসতে হয়। কয়জন আর বলুন ফিরে আসতে পারে? আবার ফিরে এসেও অনেকেই ফিরে আসতে পারেন না। কেন পারেনা? তাহলে কি পাঠক আমরা বলতে পারিনা। তাদের ফিরতে চেয়েও হয়না ফেরা।

প্রতিটি মানুষের মতোই তারকাদের মধ্যে রয়েছে প্রেম, ভালোবাসা, সংসার, জীবন। অভিনয়ের বাইরে তো তারা থাকতে চান নিজেদের মতো করে। যারা অভিনয় দিয়েই নিজেদের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন তারা আজ নিয়মিত নেই অভিনয়ে। প্রেম, ভালোবাসা, সংসার, জীবন ব্যস্ততায় তারা আর অভিনয়ে সময় দিতে পারেন না। এমন কয়েকজন অভিনেত্রীর কথাই বলব আজকে।

যারা অভিনয়ের মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাকে ধরে রেখেই চলে গেলেন অভিনয়ের বাইরে। আবার হুট করেই ফিরে আসেন তারা অভিনয়ে। বিগত কয়েক বছরে এমনটাই করছেন যারা। তারা হলেন শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি, সারিকা সাবরিন, আঁচল, রেসি, মোনালিসা। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়েছেন যে অভিনয়ে ফিরতে চেয়েও আর ফিরতে পারছেন না। কেন এমন টা হচ্ছে পাঠক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি চলুন এই লেখায়।

মোজেজা আশরাফ মোনালিসা: মিডিয়াতে যাকে সবাই মোনালিসা নামেই চেনে। এই একটি নাম মুখে আসলেই মিষ্টি হাসিতে পাগল করা মেয়ের ছবি চোখে ভেসে ওঠে। তার নামটাই যে এমন। একটা সময় লাইট-ক্যামেরা, কাট-অ্যাকশেন শুনেই তার ঘুম ভাঙত আবার ঘুমাতে যেতে হতো। অভিনয় করেছেন প্রচুর নাটকে। বিজ্ঞাপন দিয়েই মূলত তার মিষ্টি হাসি ধরা পড়ে। অসংখ্য ভক্ত তার রয়েছে। এখন আর নিয়মিত অভিনয়ে নেই তিনি। সেই সঙ্গে নেই তিনি দেশেও। আমেরিকাতে পাড়ি জমিয়েছেন সেই ২০১৪ সালে।

এরপর শুধুই নানা গুঞ্জন এর খবর আসে দেশীয় মিডিয়া পাড়ায়। আমেরিকাতে বিয়ে, তারপর সেই বিয়ে ভাঙ্গনের সুর, কষ্টে করে আমেরিকাতে বসবাস করা, জীবিকার তাগিদে নিজের চাকরি করা। এই সব গুঞ্জনে কান না দিতে সবাইকেই অনুরোধ জানিয়েছিলেন মোনলিসা। কিন্তু কোন কিছুতেই যখন আর কোন কাজ হচ্ছিল না। তখন তিনি এ বছরের ঈদুল ফিতরে দেশে ফিরে আসেন। এসে বেশ কিছু টেলিভিশন অনুষ্ঠান, নাটক ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন। তার দেশে থাকার সময় সীমা ছিল প্রায় এক মাস। এরপর আবারও তিনি হুট করেই চলে যান আমেরিকাতে। যাওয়ার সময় বলে যান আবারও হুট করেই দেশে ফিরবেন তিনি। দেশে ফিরেছেনও অভিনয় করেছেন। কিন্তু নিয়মিত হতে পারছেন না এই অভিনেত্রী।

শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি: মিডিয়ায় আসেন মডেলিং এর মাধ্যমে। ২০০৪ সালে তিনি মিস বাংলাদেশ নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি টিভি নাটকে অভিনয় শুরু করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই জনপ্রিয়তা তাকে মূলধারার চলচ্চিত্রে নিয়ে আসে। কিন্তু মাদকাসক্তি, উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন ইত্যাদি তাকে চলচ্চিত্রে নিয়মিত হতে দেয় নি। ২০০৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর বিয়ের মাধ্যমে অভিনেতা হিল্লোলের সাথে তিন্নি সংসার গড়েন। এ দম্পতির ওয়ারিশা নামে এক কন্যা সন্তানও রয়েছে। কন্যার জন্মের সময়ে মিডিয়া থেকে দূরে সরে যান তিন্নি। পরবর্তীতে আবারও ফিরে আসার জন্য বিভিন্ন নাট্যনির্মাতার সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেন তিন্নি যা পরবর্তীতে পারিবারিক কলহের জন্ম দেয়। ২০০৯ সালের শেষের দিকে তিন্নি-হিল্লোল আলাদা থাকতে শুরু করেন।

২০১২ সালের শুরুর দিকে হিল্লোলের পাঠানো ডিভোর্স লেটারে স্বাক্ষর করে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটান তিন্নি। হিল্লোলের সাথে তিন্নির বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটার পর তিন্নি মিডিয়া থেকে আরও দূরে সরে যান। মাদকাসক্তির কারণে তিনি মিডিয়ায় ফিরতে পারছেন না এবং মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন এমন সংবাদ পাওয়া গিয়েছিলো সে সময়। দীর্ঘদিন চোখের আড়ালে থাকার পর ২০১৫ সালের শেষের দিকে জানা যায় প্রায় দেড় বছর আগে ২০১৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পুরোপুরি পরিবারের অমতে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছেন তিন্নি। বরের নাম আদনান হুদা সাদ। প্রথম সংসারের কন্যা ওয়ারিশাকে নিয়ে তিন্নি শ্বশুড় বাড়িতে থাকছেন এমন সংবাদের পাশাপাশি জানা যায়, তিনি পুনরায় মিডিয়ায় ফিরে আসছেন, ছোট পর্দায় কাজ শুরু করেছেন।

আর এ নিয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয় এ বছর। অবশ্য ফিরেছিলেনও তিন্নি। ‘একই বৃন্তে’ শিরোনামের একটি নাটকের মধ্যদিয়ে আবারো অভিনয়ে নিয়মিত হয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ‘চেক পোস্ট’ নামের আরও একটি খণ্ড নাটকে অভিনয় করেন তিন্নি। মিডিয়ায় ফেরায় তার ভক্তকুলে বেশ উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, চায়ের আড্ডা সর্বত্র তাকে নিয়েই আলোচনায় মেতে ওঠেন সবাই। কিন্তু তিন্নি তার ভক্তকুলে এই উচ্ছ্বাসটা বেশিদিন স্থায়ী হতে দেননি। অল্প সময়ের জন্য ফিরে আবার আড়ালেই চলে গেছেন। তাই বলা চলে ফিরেও ফিরলেন না তিন্নি।

সারিকা সাবরিন: তিনি মডেলিং শুরু করেন ২০০৬ সালে আর অভিনয় ২০১০ সাল থেকে। কিন্তু হঠাৎ করেই ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে তিনি নাটক ও মডেলিং থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এরপর আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি তিনি। তার ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে ব্যবসায়ী মাহিম করিমের সঙ্গে হঠাৎ করেই বিয়ের কাজটি সেরেছিলেন সারিকা। এরপর মিডিয়াতে নতুন খবর আসে তিনি মা হতে যাচ্ছেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি গত বছর মে মাসে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু অভিনয়ে আর ফিরছিলেন না তিনি।

এরপর ২০১৬ সালে প্রায় তিন বছরের অভিনয় বিরতি ভেঙ্গে ঈদুল আজহায় মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ এর পরিচালনায় একটি নাটকে অভিনয় করেন। তারপর আরও বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করে তিনি মিডিয়াতে আবারও আলোচনায় আসেন। কিন্তু সেই আগের অবস্থাতেই আবারও ফিরে গেছেন তিনি। তারও অভিনয়ে ফিরতে গিয়ে আর ফেরা হলো না।

রেসি: চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন অভিনেত্রী রেসি। ২০০৩ সালে ‘গোয়ালিনী-বিনোদন বিচিত্রা ফটোসুন্দরী’ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে মিডিয়ায় পথচলা শুরু হয় তার। ২০০৪ সালে বুলবুল জিলানী পরিচালিত ‘নীল আঁচল’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় নাম লেখান রেসি। এরপর একে একে প্রায় ৪৫টি ছবিতে অভিনয় করেন। তার অভিনীত ‘এক জবান’, ‘আমার স্বপ্ন আমার অহংকার’, ‘বাজারের কুলি’, ‘স্বামীভাগ্য’, ‘অবুঝ শিশু’, ‘এরই নাম ভালোবাসা’, ‘চেহারা’ ইত্যাদি ছবিগুলো বেশ সুপারহিট হয়।

এরপর সংসার জীবনের কারণে অভিনয়ের বিরতি টানতে হয় তাকে। তবে সেটাও বেশিদিনের জন্য না। রেসি বিয়ে করে সংসার জীবনে মনোযোগী হলেও অভিনয়ের টানে আবারও সম্প্রতি কাজ শুরু করেছেন। বিরতির পর কাজে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে দুটি ছবির প্রস্তাব পান তিনি। এরমধ্যে একটি হচ্ছে সরকারি অনুদানের ছবি ‘লাল সবুজের সুর’। এটি পরিচালনা করেছেন মুশফিকুর রহমান গুলজার এবং অন্যটি হচ্ছে বন্ধন বিশ্বাসের পরিচালনায় ‘শূন্য’।

রেসির অভিনীত সব শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ‘স্বামীভাগ্য’। অভিনেতা ডিপজল অনুরোধেই তিনি অভিনয়ে ফিরে এসেছিলেন। তবে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে তিনি এখন কাজ করছেন না। বর্তমানে তার অভিনীত দুটি ছবির কাজই শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরমধ্যে সরকারি অনুদানের ‘লাল সবুজের সুর’ ছবিটির ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া কিশোরদের নিয়ে নির্মাণ হচ্ছে এটি। পরিচালনা করছেন মুশফিকুর রহমান গুলজার। আর বন্ধন বিশ্বাসের ‘শূন্য’ নামে একটি ছবির কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

২০১২ সালের ২২শে জুন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী পান্থ শাহরিয়ারকে বিয়ে করেন এ অভিনেত্রী। এরপর ২০১৩ সালের ২২শে জুলাই এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। মেয়ের নাম রাখেন প্রার্থনা। এ বছর নভেম্বর মাসে আবারো মা হয়েছেন রেসি। ২০১২ সালে রেসি অভিনীত সবশেষ ছবি ‘স্বামীভাগ্য’ মুক্তি পায়। এরপর নতুন ছবি এখনও মুক্তি পায়নি। তবে খুব শিগগিরই তার অভিনীত দুটি ছবি মুক্তি পেতে যাচ্ছে। আর অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাও করার ইচ্ছে রয়েছে তার।

কিন্তু এখন নতুন করে মা হওয়াতে দেখা দিয়েছে তারও অভিনয়ে না ফেরার ব্যাপারটি। আদৌ তিনি নিয়মিত হতে পারবেন অভিনয়ে? এমন প্রশ্নটির উত্তর হচ্ছে স্বামী, সংসার, সন্তান নিয়েই এখন তার সকল ব্যস্ততা। এখন তাহলে বলা যেতেই পারে নানা কারণে অভিনয়ে ফিরতে চেয়েও এখন ফিরতে পারছেন না এক সময়ের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী।

হাসনাহেনা আঁখি আঁচল: তার এই নাম হলেও তিনি মিডিয়া জগতে পরিচিত হয়েছেন আঁচল নামেই। অনেকদিন ধরেই চিত্রনায়িকা আঁচলের কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে না। গত বছরের ডিসেম্বরে তার অভিনীত ও দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ‘এপার ওপার’ ছবিটি মুক্তি পায়। এরপর এ বছর এখন পর্যন্ত তার অভিনীত নতুন কোনো ছবি দর্শকরা সিনেমা হলে গিয়ে দেখতে পান নি। অবশেষে এ বছরের আগস্ট মাসে নতুন চলচ্চিত্র নিয়ে ফিরেন আঁচল। নাম ‘আড়াল’। শাহেদ চৌধুরী পরিচালিত ও ত্রিভুজ চলচ্চিত্রের ব্যানারে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ৫ আগস্ট। তাই নতুন উদ্যমে আবারও কাজে মনোযোগী হয়েছেন আঁচল।

এ চলচ্চিত্রের বাইরে আরেকটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করেছেন আঁচল। নাম ‘সুলতানা বিবিয়ানা’। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন হিমেল আশরাফ। এ চলচ্চিত্রটিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন বাপ্পী চৌধুরী। তবে গত ঈদেও একটি ছবিতে আঁচল ছিলেন। তবে সেই চরিত্রটি খুব বেশি সময়ের না। শামিম আহমেদ রনি পরিচালিত এ ছবির নাম ‘মেন্টাল’। অবশ্য এখন সেন্সরে জমা পড়ার পর এ ছবির নাম রাখা হয়েছে ‘রানা পাগলা’। এ ছবিতে শাকিবের বিপরীতে তিশা অভিনয় করলেও আঁচলকে গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় তাকে।

আঁচলের হাতে রয়েছে আরেকটি চলচ্চিত্রের কাজ। তারেক শিকদার পরিচালিত এ ছবির নাম ‘দাগ’। এ ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মীম ও বাপ্পি। ছবিতে মীমের ছোট বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আঁচল। কিন্তু আঁচল যে ইচ্ছায় এসেছিলেন মিডিয়াতে সেই ইচ্ছা ইচ্ছাই রয়ে গেছে। মানে নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তিনি কিন্তু তার সেই ইচ্ছা অধরা থেকে গেল। নায়িকা হিসেবে নিজেকে তেমন ভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেননি তিনি। আর তাই তিনিও অভিনয়ে নিয়মিত হতেই পারছেন না।



Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.