সর্বশেষ সংবাদ

যৌথ প্রযোজনার ছবি (Cinema) নিয়ে সংশয়

এক সময় চলচ্চিত্রে ভিন্নমাত্রা যোগ করতে বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়ে ছবি নির্মাণ করা হতো। এতে ভিন্ন ভিন্ন দেশের সংস্কৃতির একটা সমন্বয় চোখে পড়ত। অথচ এখন বিষয়টি উল্টে গেছে। যৌথ প্রযোজনার ছবি (Cinema) নিয়ে এখন দেখা যায় সংশয়। 

যৌথ প্রযোজনার ছবি (Cinema) নিয়ে সংশয়

যৌথ প্রযোজনার নিয়মটি আসলে কী? বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণ নীতিমালা ২০১২ [সংশোধিত]-এর ৬ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, 'যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্রে প্রতি দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীর সংখ্যানুপাত সমান রাখতে হবে। একইভাবে লোকেশনও নির্ধারণ করতে হবে সমানুপাতিক হারে।' এই নিয়ম কি মানা হচ্ছে? যৌথ প্রযোজনার ছবির দিকে একটু খেয়াল করলে সাধারণ মানুষও বুঝবেন, নিয়ম না মেনেই নির্মাণ হচ্ছে ছবি। যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ আমাদের দেশে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই নানা দেশের সঙ্গে এই নিয়মে অনেক ছবি নির্মাণ হয়েছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় অর্ধশতাধিক যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মিত হয়েছে। ফলে যৌথ প্রযোজনার ছবি নিয়ে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৩ সালে প্রখ্যাত নির্মাতা আলমগীর কবিরের 'ধীরে বহে মেঘনা'র মাধ্যমে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণের সূচনা ঘটে। একই বছর ঋতি্বক ঘটকের পরিচালনায় মুক্তি পায় 'তিতাস একটি নদীর নাম' ছবিটি। শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়, ১৯৮৩ সালে ভারত, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের সম্মিলিত প্রযোজনায় 'দূরদেশ' নামের ছবিটি নির্মিত হয়েছিল। এরপর থেমে থেমে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মিত হয়েছে। যদিও সে সময়ের নিয়ম-কানুন যথেষ্ট কড়াকড়ি ছিল। তারপরও দেখা গেছে, নির্মাতারা নিয়মমাফিক কাজ করছেন। যে জন্য নির্মাতাদের যৌথ প্রযোজনার ছবি নিয়ে সমালোচনা শিকার হতে হয়নি। তাই বলে সব ছবির ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয়। চলচ্চিত্রের ইতিহাসও সে কথাই বলে। কেননা যৌথ প্রযোজনার ইতিহাস ঘাঁটলে কিছু বিখ্যাত ছবির নামও বেরিয়ে আসে- যেখানে মানা হয়নি নিয়ম। 'মনের মাঝে তুমি', 'হঠাৎ বৃষ্টি'র মতো বেশ কিছু ছবির নির্মাতারা নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা করেননি। অবাক করা বিষয় হলো, এ নিয়ে কোনো আওয়াজও ওঠেনি। মূলত এই ছবিগুলোর সাফল্যই নিয়মনীতির বিষয়টি আড়াল করে দিয়েছে। তাই বলে, কখনও আওয়াজ উঠবে না, এটা ভাবার কোনো কারণ ছিল না। 

নিয়ম ভাঙার বিষয়টি তীব্র আকার ধারণ করে 'আমি শুধু চেয়েছি তোমায়' ছবির মধ্য দিয়ে। এ দেশে ছবিটি মুক্তির সময় পরিচালকের নামের তালিকায় দেখা গেছে, কলকাতার নির্মাতা অশোক পাতির ও বাংলাদেশের অনন্য মামুনের নাম। কিন্তু কলকাতায় চোখে পড়েছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে ছবির প্রচার থেকে শুরু করে প্রদর্শন পর্যন্ত নির্মাতা হিসেবে কেবল অশোক পাতির নামটি দেখা গেঝে। বাংলাদেশি পরিচালক কিংবা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল না। ভারতের ছবি হিসেবেই সে দেশে 'আমি শুধু চেয়েছি তোমায়' প্রদর্শিত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের একজন সিনিয়র প্রযোজক বলেন, মাত্র বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা দিয়ে দেশের কোনো পরিচালকের নাম কিনে সিনেমায় ব্যবহার করা হচ্ছে। যেজন্য দেখা যায়, ওই পরিচালক শুটিংয়ের তারিখ থেকে শুরু করে অনেক বিষয়েই কিছু জানেন না। 

'আমি শুধু চেয়েছি তোমায়' ছবিতে পরিচালকের নাম সেভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়, জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত দুটি ছবি 'রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট' ও 'আশিকি' ছবির প্রদর্শনের সময়ও একই চিত্র চোখে পড়েছে। এসব ছবিতে ভারতীয় ভার্সনে পরিচালক কিংবা প্রযোজক হিসেবে বাংলাদেশের কারও নাম ছিল না। তারপরও এই প্রতারণা নিয়ে খুব একটা আওয়াজ ওঠেনি। বরং এই প্রতারণা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সেটা করা হয়েছিল বাংলাদেশে 'রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট' ও 'আশিকি' ছবির প্রচার ও প্রদর্শনের সময় পোস্টার ও হল প্রিন্টে পরিচালক হিসেবে কলকাতার অশোক পাতির নামের পাশে জাজের কর্ণধার আবদুল আজিজের নাম বসিয়ে দিয়ে। 'ব্ল্যাক' ছবির প্রচার ও প্রদর্শনেও একই রকম প্রতারণার দেখা গেছে। কলকাতার রাজা চন্দের সঙ্গে বাংলাদেশের কামাল কিবরিয়া লিপুর নামও পরিচালনায় ছিল বলে জানিয়েছিল প্রযোজনা সূত্র। অথচ 'ব্ল্যাক'-এর অফিসিয়াল টিজারে যৌথ প্রযোজনা তো দূরের কথা, বাংলাদেশের পরিচালক কিংবা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নামের ছিটাফোঁটাও ছিল না। পরিচালক হিসেবে শুধু নাম ছিল রাজা চন্দের। সর্বশেষ যৌথ প্রযোজনার নামে চলচ্চিত্র অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে 'প্রেম কি বুঝিনি' ছবিটি। এটি বাংলাদেশে মুক্তি পেয়েছে জাজের হাত ধরে! এ ছবিতেও যৌথ প্রযোজনার কোনো নিয়ম মানা হয়নি। অশোক ধানুকার প্রযোজনায় ছবির দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন কলকাতার দুই অভিনয়শিল্পী ওম ও শুভশ্রী। এমন কী ছবির কলাকুশলীরাও সবাই ভারতের। যে কারণে প্রশ্ন উঠেছে, এ ধরনের ছবিকে কীভাবে যৌথ প্রযোজনার ছবি বলা হয়? আর এভাবে যৌথ প্রযোজনা নামে যে ছবিগুলো নির্মিত হচ্ছে, তাতে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের আদৌ কি কোনো উন্নয়ন ঘটবে? 

এমন প্রশ্নের জবাবে নায়করাজ রাজ্জাক বলেন, 'আমি মনে করি না যৌথ প্রযোজনার নামে এভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ হলে ভালো কোনো ফল পাওয়া যাবে। যেজন্য অনেক দিন ধরে যৌথ প্রযোজনার ঘোরবিরোধিতা করে আসছি। এ কথা ঠিক যে, বেশ কয়েক বছর ধরেই আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গনে মন্দা হাওয়া বইছে। আর এখন যৌথ প্রযোজনার নামে যা হচ্ছে তা আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য আত্মঘাতী। বিষয়টি চলচ্চিত্রের খারাপ অবস্থায় শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার মতো। একে তো নিয়ম মেনে ছবি নির্মিত হচ্ছে না, দ্বিতীয়ত এ নিয়ে আওয়াজও তুলছে না কেউ। অথচ পেছন ফিরে তাকালে ভিন্ন চিত্রই চোখে পড়ে। এক সময় চলচ্চিত্রে ভিন্নমাত্রা যোগ করতেই বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়ে ছবি নির্মাণ করা হতো। এতে ভিন্ন ভিন্ন দেশের সংস্কৃতির একটা সমন্বয় চোখে পড়ত। অথচ এখন পুরো বিষয়টি উল্টে গেছে। ১৯৮৬ সালের যৌথ প্রযোজনার নীতিমালায় সব দেশের শিল্পীদের সমান হারে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা বাধ্যতামূলক ছিল। এ নিয়ম পালন না করলে সেটাকে 

কোনোভাবেই যৌথ প্রযোজনার ছবি বলা যাবে না। ফলে, যা হওয়ার তাই হচ্ছে। নন্দিত অভিনেত্রী কহিনুর আক্তার সুচন্দা বলেন, 'দুই দেশের তারকা শিল্পীদের এক মঞ্চে হাজির করতে, চলচ্চিত্রের গল্পে নতুন চমক তৈরি করতে যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ হতেই পারে। যা আমাদের দেশে আগেও হয়েছে। কিন্তু নীতিমালা মেনে করলে কোনো সমস্যা নেই। নিতিমালা না মানা হলে উভয় পক্ষেরই ক্ষতি হয়।' নিয়ম না মেনে যৌথ প্রযোজনার ছবির নির্মাণে অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি আছে এসব ছবির নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীদের বিভিন্নভাবে ঠকানোর অভিযোগ। এ ছাড়াও যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবিতে এদেশের শিল্পীদের ছোট করে দেখার বিষয়েও অনেকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যে চরিত্রে কলকাতার প্রতিষ্ঠিত নায়িকারা আপত্তি জানাচ্ছেন সেই চরিত্রই এ দেশের নায়িকাকে দেওয়া হচ্ছে। তার জ্বলন্ত উদাহরণ 'আশিকি' ছবিটি। এই ছবির চরিত্র নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন চিত্রনায়িকা মৌসুমী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিনেতা বলেন, 'তারা আমাদের শিল্পীদের নামে মাত্র কাস্টিং করেন এ দেশের বাজার ধরার জন্য। অথচ এটা না করে আমাদের উচিত দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে সঠিক নিয়মনীতি মেনে কাজ করা। যা অনেকেই করছেন না।' দেশের অর্থনীতিবিদদের মতে, যৌথ প্রযোজনার নামে মূল প্রতারণা হয় আর্থিক খাতে। যৌথ প্রযোজনার আড়ালে ভয়াবহ রকম অর্থ পাচার করা হচ্ছে বলেই অনেক চলচ্চিত্র বোদ্ধারা অভিযোগ করেছেন। শিগগিরই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তথ্য, অর্থ, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চলচ্চিত্রপ্রেমীরা। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, অনিমেষ আইচ, অমিতাভ রেজা, মেজবাউর রহমান সুমন, রেদওয়ান রনিসহ এ প্রজন্মের নির্মাতারা মনে করেন, যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ অতীতেও হয়েছে, এখনও হতে পারে। তবে তা হতে হবে সমতার ভিত্তিতে। তাই উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণে ১৯৮৬ সালের নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই।

গত বছর থেকে যৌথ প্রযোজনার ছবিতে কাজ শুরু করেছেন শাকিব খান। যদিও শুরুতে যৌথ প্রযোজনার ছবিতে কাজের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখাননি এই অভিনেতা। কিন্তু শেষমেশ অভিনয়ে আর আপত্তি করেননি। এর কারণ জানতে চাইলে শাকিব খান বলেন, 'যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত যে দুটি ছবিতে আমি অভিনয় করেছি, সেগুলো নীতিমালা মেনেই করা হয়েছে। আমি চাই, যৌথ প্রযোজনার ছবিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বার্থই ওপরে থাকবে।' মাহিয়া মাহি বলেন, 'আমি যৌথ প্রযোজনার ছবির পক্ষেও না বিপক্ষেও না। তবে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণের কারণে আমাদের প্রোডাকশনের ভ্যালু বাড়ছে। দেশের বাইরে দৃশ্যধারণ হচ্ছে। দর্শকরা নতুন লোকেশন দেখতে পারছেন। তবে যৌথ প্রযোজনার ছবির যে নিয়মনীতি আছে সেটা মেনে কাজ করলে আরও ভালো হতো। তা না হবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।' তাদের এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে এটাই বলা যায় যে, যৌথ প্রযোজনায় ছবি একদিকে যেমন দর্শকের কাছে নতুন কিছু উপহার দিতে পারে, তেমনি মেলবন্ধন ঘটাতে পারে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির। কিন্তু নিয়মনীতি না মানার কারণে যৌথ প্রযোজনার ছবিগুলো দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য আত্মঘাতী বলেই প্রমাণিত হবে। তাই যৌথ প্রযোজনার নামে যে ছবিগুলো নির্মিত হবে, তা অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে নির্মাতা এবং অন্যান্য কলাকুশলীসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের কারও মধ্যে যেন কোনো সংশয় না থাকে- সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে দর্শকের কাছে প্রমাণ করতে হবে, যৌথ প্রযোজনার ছবি মানে ভিন্ন রকম একটি আয়োজন।



Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.