সর্বশেষ সংবাদ

রহস্যময় (Mysterious) কিছু দুর্ভাগ্যের ঘটনা

আপনি যদি সুন্দর কোনো কাহিনী দেখতে চান, তাহলে এই গল্প আপনার জন্যে নয়। এই ঘটনার নেই কোনো ভাল শুরু, না কোনো ভালো শেষ, হয়তোবা সামান্য কিছু ভালো থাকতে পারে মাঝ দিয়ে। কিন্তু আপনাদের কোনো সুন্দর গল্প পাওয়ার ইচ্ছা থাকলে, আপনারা অন্য কিছু দেখতে পারেন।

রহস্যময় (Mysterious) কিছু দুর্ভাগ্যের ঘটনা

না, এটা আমার কথা নয়। এটি লেমনি স্নিকেট এর কথা, যিনি বোডুল্যার চিলড্রেনদের দুর্ভাগা ইতিহাস তুলে ধরেন তার গল্পের মাধ্যমে।

লেমনি স্নিকেট আমেরিকান লেখক ড্যানিয়েল হ্যান্ডলার এর ছদ্মনাম। কিন্তু ‘Lemony Snicket’s A Series of Unfortunate Events’ উপন্যাস সিরিজে তিনি তার এই ছদ্মনামকে ব্যবহার করেন গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এবং ন্যারেটর হিসাবে, যার পার্সপেক্টিভ থেকে আমরা জানতে পারি তিন ভাই বোন ভায়োলেট, ক্লাউস এবং সানি বোডুল্যার এর অদ্ভুত এবং দুঃখের ইতিহাস।

লেমনি স্নিকেট চরিত্রের মাধ্যমে এই রহস্যপূর্ণ ঘটনা উপন্যাসে তুলে ধরা হয়, খুবই ইউনিক স্টাইলে, যে কারণে এই সিরিজটি আলাদা দৃষ্টি আকর্ষণ করে সকলের। ডার্ক ফ্যান্টাসি, স্যাটায়ার, রহস্যে পরিপূর্ণ এই তেরটি উপন্যাসের ইয়ং-এডাল্ট সিরিজ ১৯৯৯-২০০৬ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়, এবং একই সময়ের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘Harry Potter’ সিরিজের জনপ্রিয়তার পরেও, এই সিরিজের আলাদা জনপ্রিয়তা ছিল এর অন্যধরনের লেখনির কারণে।

এই সিরিজের প্রথম তিন উপন্যাস নিয়ে ২০০৪ সালে মুক্তি পায় একই নামের মুভি, যাতে অভিনয় করেন জিম ক্যারি। তবে আমরা মুভি নিয়ে আলোচনা করবো না। করবো এই বছরে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া আট পর্বের সিরিজ নিয়ে।

ভিক্টোরিয়ান গথিক স্টাইলে, কিন্তু পোস্ট-মর্ডান আর মেটাফিকশন এর ভঙ্গিতে লিখিত তেরটি উপন্যাসের প্রথম চারটি উপন্যাস নিয়ে, প্রতি উপন্যাস দুই এপিসোডে ভাগ করে, এই সিজনের আট এপিসোড তৈরি হয়েছে। পরবর্তী পাঁচটি নিয়ে তৈরি হবে দ্বিতীয় সিজন এবং বাকি চার উপন্যাস নিয়ে শেষ এবং তৃতীয় সিজন।

বোডুল্যার চিলড্রেন দের বাবা-মা তাদের বাড়িতে আগুন লাগার কারণে দূর্ঘটনায় মারা যায়। তিন ভাই বোন ভায়োলেট, ক্লাউস আর সানি সৌভাগ্যক্রমে (অথবা দুর্ভাগ্যক্রমে) বেঁচে যায় বাড়িতে সে সময় না থাকার কারণে। তিন ভাই-বোনেরই রয়েছে আলাদা গুণ। বড় বোন ভায়োলেট এর রয়েছে অসাধারণ যন্ত্র তৈরির ক্ষমতা। একমাত্র ভাই ক্লাউসের রয়েছে ফটোগ্রাফিক মেমরি, সে যা পড়ে তা সে ভুলে যায় না। আর সবার ছোটো বাচ্চা সানির রয়েছে চারটি তীক্ষ্ণ দাঁত, যার মাধ্যমে যে যেকোনো শক্ত জিনিস কাটতে পারে। বাবা-মা মারা যাবার কারণে তাদের বিশাল সম্পত্তি এখন ভায়োলেটের নামে। কিন্তু সে তা হাতে পাবে নির্দিষ্ট বয়স হলে। তাই তাদের থাকতে হবে আইনগত অভিভাবকের কাছে। আর এই বিশাল সম্পত্তির লোভে আছে তাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় কাউন্ট ওলোফ।

প্রথমে সিরিজের ন্যারেটিভ নিয়ে কথা বলি। আগেই বলেছি, লেমনি স্নিকেট এর ভাষ্যে আমরা বোডুল্যার চিল্ড্রেনদের কাহিনী জানতে পারবো। সিরিজে লেমনি স্নিকেট কে প্রথম থেকেই শুধু কণ্ঠে নয়, একজন পার্সন হিসেবে দেখানো হয়েছে। ক্ষনে ক্ষণে লিনিয়ার কাহিনীর সাথে, তাকে একই ফ্রেমে দেখিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা এবং তার কী কারণ এই ঘটনার তদন্ত করা, সেটা দেখানো হয়েছে।সিরিজটি আকর্ষণ করার প্রথম কারণ এটি। কাহিনীর সাথে মিলিয়ে তার হিউমার বা ড্রেসাপও বেশ আলাদা ভাব দিয়েছে।

লেমনি স্নিকেট ছদ্মনাম হলেও, ড্যানিয়েল হ্যান্ডলার তার বইয়ে চেষ্টা করেছিলেন চরিত্রটা এবং ঘটনাকে যথেষ্ট বাস্তবসম্মত করার জন্যে। সেই লক্ষ্যে তিনি তেরটি উপন্যাসই উৎসর্গ করেন গল্পের চরিত্র বিয়াট্রিসকে, যে কিনা ন্যারেটর লেমনি স্নিকেট এর লাভ ইন্টেরেস্ট। আর এখানে, প্রতি উপন্যাসের শুরুর এপিসোডে সেই উৎসর্গপত্র দেখানো হয়।

যদিও লেমনি স্নিকেট প্রায় সবসময়ই বলে গেছে, যে এই কাহিনিতে আনন্দের কিছু নেই, কিন্তু পুরো ঘটনাই প্রচন্ড পরিমাণে ডার্ক হিউমার আর স্যাটায়ারে ভরপুর। যদিও পুরো কাহিনীই বেশ ডার্ক এবং সিরিজ এডাপ্টেশনের ডার্ক ভাব রাখার জন্য কালার খুবই ডার্ক টোনে রাখা হয়েছে। কিন্তু এতেই বরং কাহিনির মেজাজটা ভালো বোঝা গেছে এবং দেখে আরাম পাওয়া গেছে।

ডার্ক হিউমার এর কথায় আসলে, এবার সিরিজের মূল আকর্ষণের দিক আসা যায়। যার নাম, কাউন্ট ওলোফ। কাউন্ট ওলোফের জীবনের উদ্দেশ্য…মানে কিনা বোড্যুল্যাররা এতিম হবার পর থেকে তার জীবনের উদ্দেশ্য যেকোনোভাবে তাদের সম্পত্তির দখল নেয়া। আর এই লক্ষ্যে হেন কাজ নেই, যা সে করেনি। জিম ক্যারি মুভি এডাপ্টেশনে এই চরিত্রটি করেছিলেন। আর এই সিরিজে করেছেন নিল প্যাট্রিক হ্যারিস। দুর্দান্তভাবে এই চরিত্রটি করে গেছেন তিনি। কমেডি তার জন্মগত গুণ। কিন্তু এই সিরিজে এই চরিত্রটির মাধ্যমে তার সকল প্রতিভা যেন ঢেলে দিলেন। কাউন্ট ওলোফের আলাদা আলাদা পরিচয় আর হাস্যকর নাটক এর সবটুকুতে নিল প্যাট্রিক তার সেরাটা ঢেলে দিয়েছিলেন। সিরিজের প্রাণ তাকে বলা যায়, কারণ তাকে দেখার জন্যেই আলাদা একটা আকর্ষণ কাজ করেছে।

ভায়োলেট চরিত্রে অভিনয় করেছে ম্যালিনা ওয়েইজম্যান, যাকে CW চ্যানেলের ‘Supergirl’ এর ছোটবেলার চরিত্র করতে দেখা গেছে। ক্লাউস চরিত্রে অভিনয় করেছে লুইস হ্যানেস আর সানি চরিত্রে প্রিসলি স্মিথ। এই বাচ্চাটাও দারুণ খেলা দেখিয়েছে।

লেমনি স্মিকেট এর চরিত্রে অভিনয় করেন প্যাট্রিক ওয়ারবার্টন। তার এপেয়ারেন্স আর স্যাটায়ার-হিউমার মেশানো ন্যারেটিং বা ডায়লগ ডেলিভারি বেশ আগ্রহ জন্মায় কাহিনীটার প্রতি। তবে কাউন্ট ওলোফের পরেই যাকে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ব্যাংকার মিস্টার পো চরিত্রে কে টোড ফ্রিম্যান কে।

না, ইনি মরগ্যান ফিম্যান এর কোনো আত্মীয় নন। কে টোড ফ্রিম্যান এর ব্রডওয়েতে আলাদা সুনাম আছে। আছে দুইটি টনি এওয়ার্ড নমিনেশন। এই সিরিজে বোডুল্যারদের ব্যাংকার হিসেবে মিস্টার পো চরিত্রে তার সবসময় বিরক্তিকরভাবে কাশতে থাকা দুর্দান্ত ব্যঙ্গাত্মক চরিত্র সবসময়ই আলাদা নজড় কেড়েছে। আর চরিত্রটির বিরক্তিকর দিকগুলো আমাদের অনুধাবণ করাতেও দারুণ সফল ছিলেন তিনি।

সিরিজের প্রথম আকর্ষণ বলেছিলাম ন্যারেটিভ। আরেকটি আকর্ষণ এর স্ক্রিপ্ট। উপন্যাসকে কেমন এডাপ্ট করা হয়েছে, সেটা বুঝতে তেরটি উপন্যাস না পড়লেও চলবে। ২০০৪ সালের মুভি এডাপ্টেশন দেখা থাকলেই আপনি বুঝতে পারবেন, সিরিজে বেশ ভালোই ডিটেলস ফলো করা হয়েছে। কারণ মুভিতেও ঠিকই একই ডিটেলস পাবেন। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুভির কিছু ব্যাপার নেয়া হয়েছে একদম পুরোপুরিই, মুভির সাথে কিছুটা মিল রাখার জন্যে।

সংলাপগুলোতে পর্যাপ্ত হিউমার রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, কারণ কাহিনী যেহেতু পুরো কমেডি না, তাই ডায়লগ বা ঘটনার মাঝেই হিউমার রাখা হয়েছে। তাছাড়া, ডায়লগগুলো দারুণভাবে সাজানো ছিল। একটা উদাহরন দিই। এটা অবশ্য লেমনি স্নিকেট এর ন্যারেটিভ থেকে। ডায়লগটা এমন ছিল, ‘সে বাক্যটি দুইবার পড়লো,’ এই ডায়লগটি দুইবার বলা হয়। আবার ধরুণ সিজন ফিনালে তে কয়েকবার ভুল করে ‘this month, this year,’ বলার পরে ‘this season’ বলা বা ‘end of this season’ বলে সিরিজের সিজন ব্যাপারটাকে তুলে ধরা। বুঝতেই পারছেন, স্ক্রিপ্ট কতোটা মাথা খাটিয়ে তৈরি করা, যেন ছোটো অংশগুলোও আমাদের আকর্ষণ করে।

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ভালো ছিল। প্রতি আলাদা উপন্যাস এর এপিসোডে আলাদা আলদা টাইটেল ও থিম সং ব্যবহৃত হয়েছে।

ভিক্টোরিয়ান গোথিক স্টাইলে উপন্যাসগুলো লেখা হলেও, মূলত একটি ফিকশনাল বা অল্টারনেট যুগে সেট করা, যা কিনা ১৯ শতক বা ১৯৩০ এর দশক, দুটোর বৈশিষ্ট্যই বহন করে। তবে সিরিজে সময়টা আরেকটু এগিয়ে আনা হয়েছে।

অনেক পজিটিভ দিক বললাম। এবার আসি সামান্য কিছু নেগেটিভ দিকে। আলাদা আলদা ভাবে অনেক কিছুই আকর্ষণ করতে পারলেও, পুরো সিরিজ ‘as a whole’ আকর্ষণ করতে পারেনি। আর মূলত সিরিজটি ইয়ং-এডাল্ট জন্রা বললেই ভালো হয়। কিন্তু বেশ ডার্ক থিমের কারণে ছোটদেরও ভালো লাগবে কিনা সন্দেহ। তবে শুধু যে কাহিনী বললাম, গল্প যে এতো সহজ কাহিনী নিয়ে আগাচ্ছে না, সেটা দেখতে থাকলেই বুঝতে পারবেন।

যারা আগের মুভিটি দেখেননি, অথবা উপন্যাস পড়েননি, তাদের সবার কাছে অতোটা ভাল লাগবে না এই সিরিজ। তবে আমার মতো যারা ২০০৪ এর মুভিটি দেখেছেন, তাদের কাছে কিছুটা আগ্রহের বস্তু এই সিরিজ। কারণ সেই সময়ে দেখে মুভিটির প্রায় কিছুই বুঝিনি, বা বুঝলেও অনেক প্রশ্ন ছিল। কারণ মুভিতে অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি ছিল। আর সেইসব উত্তরের জন্য সিক্যুয়েল এর সম্ভাবনা ছিল বেশ। কিন্তু বোডুল্যার চিল্ড্রেন এর চরিত্রের তিন অভিনেতা-অভিনেত্রীই বড় হয়ে যাওয়া সেই সিক্যুয়েল আর হয় নি। তাই যারা আমরা উপন্যাস পড়িনি, কিন্তু মুভিটি দেখেছিলাম, তাদের কাছে কিছুটা কৌতুহলের বস্তু এই সিরিজ অবশ্যই।

নেটফ্লিক্সের অন্যান্য সিরিজের তুলনায় প্রথম থেকেই সেভাবে আকর্ষণ করতে না পারলেও, হিউমার, স্যাটায়ার আর রহস্যে পূর্ণ গল্প জানতে চাইলে এই সিরিজটি বেশ ভালোই, আর পরের এপিসোডগুলো বেশ ভাল আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে উল্লেখিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো চোখে বাঁধলে দেখার আগ্রহটা আরেকটু বাড়ে। কিন্তু সবমিলিয়ে মনে হয় কোথায় যেন একটু খাদ রয়ে গেল। তবে টিনএজারদের এই সিরিজটি ভাল লাগতে পারে, যদি তাদের ইয়ং-এডাল্ট ফিকশনের প্রতি আগ্রহ থাকে।

প্রথম সিজনের ভালো অনুভূতির মতো আশা করি আরো প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বাকি দুই সিজন আরো বেশি ভালো হবে। আর সাথে নিল প্যাট্রিক হ্যারিস এর এনার্জেটিক পার্ফর্ম্যান্স দেখার আগ্রহ তো কাজ করবেই।



Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.