সর্বশেষ সংবাদ

টিভি নাটক (TV NATOK) এর বাজেট

নেই ভালো গল্প,একই লোকেশন, ধারাবাহিক নাটকে নেই ধারাবাহিকতা, অভিনয়শিল্পীদের অভিনয় নিষ্প্রাণ। টিভি নাটকে এসব সমস্যা লক্ষ্য করা গেছে কয়েক বছর ধরেই। এসব সমস্যার মূল কারণ খুঁজে পেয়েছেন নাট্যবোদ্ধারা, তা হলো 'বাজেটস্বল্পতা'। স্বল্প বাজেটের কারণে হাতেগোনা কয়েকটি নাটক বাদে বেশিরভাগ নাটকই মানহীন। টিভি নাটক (TV NATOK) এর বাজেট আসলে কত? 

টিভি নাটক (TV NATOK) এর বাজেট

একসময় নাটক মানেই ছিল বিটিভির অন্ধকার সেটে শুটিং, যেখানে দিনরাত আলাদা করার উপায় ছিল না, একই সেটে অনেক নাটকের দৃশ্যায়ন। তবুও মানুষ অপেক্ষায় থাকত প্রিয় নাটকের জন্য। কিন্তু কেন? কারণ সেই নাটকগুলোর গল্প দর্শকের মন ছুঁয়ে যেত। দর্শক নাটকের মাঝে আবিষ্কার করতেন নিজেদের জীবনকে। তখন নাটক দেখার জন্য পরিবারের সবাই তড়িঘড়ি করে ঘরের কাজ এগিয়ে নিতেন, বাড়ির ছেলেমেয়েরা আগামী দিনের স্কুলের পড়া আগেভাগে শেষ করত, রাস্তা-ঘাট খালি হয়ে যেত নাটক দেখার জন্য। পরদিন অফিস-আদালতে, চায়ের দোকানের আড্ডায় গত রাতের নাটকের পর্যালোচনা চলত। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ভারতের দর্শক বাংলাদেশের নাটক দেখার জন্য অ্যান্টেনা তাক করে থাকতেন। অথচ মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের দর্শক মুখিয়ে থাকেন কলকাতার সিরিয়াল দেখার জন্য। স্টার জলসা, জি বাংলা, স্টার প্লাসের সিরিয়াল এখন ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু যখন বিটিভিতে প্যাকেজ নাটকের যাত্রা শুরু হলো, তখন অন্ধকারের যুগ পেরিয়ে আলোর মুখ দেখল দর্শক, বিভিন্ন লোকেশনে চিত্রায়ন হতে শুরু হলো, নাটকের গল্পে এলো ব্যাপক পরিবর্তন। সেই সময় প্যাকেজ নাটক যেন চৈত্রের তপ্তফাটা মাঠে এক চিলতে শান্তির বৃষ্টি হয়ে ঝরেছিল। দর্শক পেল এক নতুন অভিজ্ঞতা। চকচকে স্ক্রিন, আধুনিক সেট, গল্প, অভিনয় সবই যেন নতুন, গৎবাঁধা সেই নাটক নয়। বিচিত্রসব গল্প উঠে এলো নাটকে। ধীরে ধীরে এ দেশে যাত্রা শুরু করল স্যাটেলাইট চ্যানেল। বাড়ল চ্যানেল, অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক। কিন্তু শুধু বাড়ল না নাটকের মান। এ দেশের টিভিতে এখন প্রতিদিন এক ঘণ্টা, ধারাবাহিক সব মিলিয়ে প্রায় ৩০টি নাটক প্রচার হয়। তারকাসমৃদ্ধ এসব নাটকের বেশিরভাগেই নেই আগের মতো সেই জৌলুস। কিন্তু কেন? প্রশ্নটির উত্তর খুব সহজ। নাটক এখন আর দর্শক-হৃদয় ছুঁয়ে যায় না। কারণ প্রচার হওয়া বেশিরভাগ নাটকে নেই গল্প, লোকেশনের ভিন্নতা, ধারাবাহিকে নেই ধারাবাহিকতা, শিল্পীদের অভিনয়ে নেই কোনো প্রাণ। এসব সমস্যা টিভি নাটকে গত কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্য করা গেছে। এসব সমস্যার পেছনে একটাই বিশেষ কারণ খুঁজে পেয়েছেন নাট্যবোদ্ধারা। নাটকের এ বেহাল দশার অন্তরালে যে সমস্যাটি বারবার সামনে এসেছে, তা হলো 'বাজেটস্বল্পতা'। ফলে হাতেগোনা কয়েকটি নাটক বাদে বেশিরভাগই মানহীন। যে কারণে দর্শক বিদেশি নাটক দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন নির্মাতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি ভালো নাটক নির্মাণে নব্বইয়ের দশকে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পাওয়া যেত। গল্পভেদে এর পরিমাণ আরও বেশি হতো। কিন্তু বর্তমানে একটি এক ঘণ্টার নাটকের জন্য ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা পাওয়া যায়। অথচ নির্মাণ ব্যয় থেকে শুরু করে শিল্পীর সম্মানী সবকিছু আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়েছে। প্যাকেজ নাটক, পৃথিবীতে বোধ হয় এই একটা জিনিসেরই দাম সবচেয়ে বেশি কমেছে গত পাঁচ বছরে। তা হলে প্রশ্ন দাঁড়ায় নাটকের বাজেট আসলে এখন কত? একটি নাটকের খরচের ধাপগুলো হলো_ শুটিং লোকেশন, প্রপস, প্রডাকশন ম্যানেজার এবং বয়, ক্যামেরা, লাইটস, ট্রলি/ডলি, জিব আর্ম, ক্রেন, স্টেডিক্যাম, গাড়ি, খাবার, সম্পাদনা, ক্যামেরাম্যান, সহকারী পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক। সাধারণত কম বেশি সব নাটকের ক্ষেত্রে উপরের বিষয়গুলো খরচ প্রায় একই ধরনের হয়ে থাকে। তবে খরচের বড় একটা অংশ যায় শিল্পী সম্মানী বাবদ। কোন শিল্পীকে নিয়ে কাজ করা হবে তার ওপর নাটকের বাজেট ওঠানামা করে। আর এ দেশে শিল্পী সম্মানীর কোনো নির্ধারিত তালিকা নেই। ফলে যে যার মতো করে শিল্পী সম্মানী আদায় করে নিচ্ছেন। একটি নাটকের মূল বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি দিতে হয় শিল্পী সম্মানী বাবদ। এখন এক ঘণ্টার নাটকের গল্পের জন্য গল্পকারকে দেওয়া হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়ে কমও দেওয়া হয় তাকে। অথচ গল্পই একটি নাটকের প্রাণ। একজন ক্যামেরাম্যানকে প্রতিদিনের জন্য ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা, এ ছাড়াও প্রধান সহকারী পরিচালকের সম্মানী আলোচনা করে ঠিক করে নেন। তবে অন্য সহকারী পরিচালক প্রতিদিনের জন্য ৫০০/১০০০ বা সর্বোচ্চ ২০০০ টাকার বেশি পান না। লাইটের ক্ষেত্রে গড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা লাগে। ক্যামেরা ভাড়া ৩ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটা নির্ভর করছে কোন ক্যামেরা দিয়ে নাটকটির চিত্রায়ণ হচ্ছে তার ওপর।

ফলে একটি ভালো নাটক নির্মাণের জন্য প্রয়োজন ভালো বাজেটের। এ প্রসঙ্গে ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি গাজী রাকায়েত বলেন, 'নাটকের জন্য আমাদের এখানে কোনো প্রপার বাজেট নেই। ফলে আমাদের প্রথমেই একটা স্ট্যান্ডার্ড বাজেট তৈরি করতে হবে। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ, স্পন্সর যারা আছে তাদের সঙ্গে কথা বলে নাটকের জন্য একটা ভালো মানের বাজেট নির্ধারণ করতে হবে। আমরা ডিরেক্টরস গিল্ড থেকে বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি।'

আজাদ আবুল কালাম বলেন, 'নাটকের গল্প অনুযায়ী বাজেট দিতে হবে। গল্পের দৃশ্যায়ন যদি থাকে সুন্দরবনে, বান্দরবান, আবার শুটিং স্পট যদি হয় উত্তরা এই দুই নাটকের বাজেট নিশ্চয় এক হবে না। যোগ্য লোক দিয়ে কাজ করালে নিশ্চয়ই তার জন্য খরচ বেশি হবে। চ্যানেল ও প্রযোজক সবাইকেই এই দিকে খেয়াল রাখা উচিত।' তৌকীর আহমেদ বলেন, 'গল্প, লোকেশনে ভিন্নতা, শিল্পীরা মন দিয়ে কাজ করছেন না- এসব কারণে টিভি নাটক থেকে দর্শকরা সরে যাচ্ছেন। নাটকের এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাজেট-স্বল্পতার সমস্যাকে উপড়ে ফেলতে হবে।'

মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, 'এখনকার নাটকগুলোর গল্পে কোনো ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে না। সেই ৫-৬ বছর আগে যেমন গল্প নিয়ে কাজ হয়েছে, এখনও সেই গল্পগুলোই ঘুরে ফিরে বারবার আসছে। যাদের হাত ধরে নাটকের গল্পে পরিবর্তন হয়েছিল, তারা এখন মিডিয়ার অস্থিরতার কারণে নাটক বানানো থেকে দূরে চলে গেছেন। ফলে নতুন পরিচালকরাও কিছু শিখতে পারছেন না।' নির্মাতা সাইফুল আলম শামীম বলেন, 'দেড় লাখ টাকায় এই বাজারে ভালো মানের এক ঘণ্টার নাটক নির্মাণ সম্ভব নয়। কিন্তু এর চেয়েও কম বাজেটে এক ঘণ্টার নাটক নির্মিত হচ্ছে। এর জন্য আমাদের নির্মাতারাও দায়ী। আমরা কম বাজেটে নাটক নির্মাণ করে দিচ্ছি বলেই টিভি চ্যানেলগুলো সেই সুযোগটা নিচ্ছে।' 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি এক ঘণ্টার নাটক বা ধারাবাহিক নাটক কেনার ক্ষেত্রে টিভি চ্যানেলগুলোতে নির্দিষ্ট কোনো মূল্য নির্ধারণ করা নেই। 

টেলিভিশন নাটক নির্মাণ, ক্রয় ও প্রচারে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোর কোনো নীতিমালা নেই। ফলে যে কেউ তার ইচ্ছামতো নাটক নির্মাণ করে টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেটা প্রচার করতে পারছেন। দেশীয় নাটককে বাঁচাতে ভালো বাজেট চাই। এ নিয়ে কী ভাবছে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ? এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ বলেন, 'এনটিভিতে নিয়মিত একক নাটক ও ধারাবাহিক নাটক প্রচার হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা বাছাই করা, মানসম্মত নাটক প্রচার করে থাকি। যদিও বাজেটের সীমাবদ্ধতা আছে। তবে এ কথা ঠিক, ভালো বাজেট দিলেই ভালো নাটক হবে, এমন কোনো কথা নেই।' বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান প্রধান শামীম শাহেদ বলেন, 'স্বল্প বাজেটের কারণে নাটকের মান হারাচ্ছে, দর্শক নাটক দেখছে না, এ কথার সঙ্গে আমরা একমত না। কারণ ৫ বছর আগে একটি একক নাটক যে টাকা দিয়ে কিনতাম, এখন তার চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে এক ঘণ্টার নাটক কিনছি। আর বাংলাভিশন নাটকের মান রক্ষার জন্য সদা প্রস্তুত। যে কারণে আমরা চেষ্টা করি বিশেষ দিবসের জন্য ভালো বাজেট দিয়ে ভালো নাটক নির্মাণের।'

আরটিভির সিইও সৈয়দ আশিক রহমান বলেন, 'একটি ভালো নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করা দরকার তা-ই করার চেষ্টা করি।'

মানহীন নাটকের জন্য চ্যানেল দায়ী করছে নির্মাতাদের। নির্মাতারা দায়ী করছেন অল্প বাজেটকে। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাদের আর্থিক অসঙ্গতির জন্য বিজ্ঞাপনের বাজেট কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন। আর বিজ্ঞাপনদাতারা দায়ী করছেন চ্যানেলগুলোর দর্শক হারানোকে। যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে সবাই হয়তো ঠিকই বলেছেন। সবাই তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। কিন্তু সমাধানের পথ কী হবে সেটা নির্দিষ্ট করতে পারছেন না। এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায়গুলো আসলে টিভি নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাই করতে পারবেন। সেই সঙ্গে সৃজনশীল মানুষকে যুক্ত করতে হবে এ পেশায়। তবেই টিভি নাটক দর্শকের কাছে আবার গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।



Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.