সর্বশেষ সংবাদ

ভালো কাজ করলে অনেকদিন টিকে থাকা যায়: Shuvro dev

তিন দশকের জনপ্রিয় গায়ক Shuvro dev। তার গাওয়া বহু গান আমাদের জীবনযাত্রায় মিশে আছে।তাকে নিয়ে নতুন করে হয়তো বলার কিছু নেই। তারপরও এই প্রজন্মকে বারবার তার কথা জানাতে চাই। তিনি সেরা গায়ক এই পরিচয়টার পাশাপাশি যে ব্যাপারটা আমরা লক্ষ্য করলাম, তিনি বেশ সময়ানুবর্তী। ঘড়ির সেকেন্ডের কাটা মেনে তিনি তার পথ চলেন। মুখে না বললেও বড় হবার পিছনে এটাও একটা কারণ। তার এই সময়ের সাথে মিল রেখে শত ব্যস্ততার মাঝে তিনি সময় দিয়েছিলেন, কথা বলেছিলেন বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে।

Shuvro dev

বর্তমান সময় কেমন যাচ্ছে?

শুভ্র দেব: এইতো শেষ কয়েক মাসে আমেরিকা গিয়েছি। নিজের কিছু কাজ করেছি আবার প্রোগ্রামও করেছি। বর্তমানে ঢাকাতে আছি। টিভিতে কিছু প্রোগ্রাম করলাম। বাংলাভিশনে একটা প্রোগ্রাম করলাম, এনটিভিতে একটা লাইভ শো করলাম। সাথে বিটিভিতেও কিছু প্রোগ্রাম করলাম। গত মাসেও ভার্জিনিয়াতে একটা প্রোগ্রাম করেছি- পিঠা উৎসব। সব মিলিয়ে এইতো, ভালোই যাচ্ছে।

শুভ্র দেবকে আমরা অনেকদিন তেমন সক্রিয়ভাবে দেখছি না। এটা নিয়ে যদি একটু বলতেন?

শুভ্র দেব: না, আমি তো শেষ কয়েক বছরেও অনেকগুলো প্রোগ্রাম করেছি। আমি আসলে খুব কোয়ালিটি বজায় রেখে কাজ করি। অল্পই কাজ করি। অন্যদের মতো অনেকগুলো কাজ করি না। এটা আমি ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বজায় রেখে চলছি।

আমরা যদি একটু পিছনে চলে যাই, গানের জগতে কীভাবে আসা? যদিও আমরা অনেকেই জানি, তবুও আপনার কাছেই আবার জানতে চাই।

শুভ্র দেব: আমি আসলে খুব ছোটবেলা থেকে তবলা বাজাতাম। আমার বড় বোনের গানের সাথে তবলা বাজাতাম। নতুন কুঁড়িতেও ছিলাম। সেখানেও তবলাই বাজাতাম এবং তবলাতে আমি একবার প্রথম হয়েছিলাম। এরপর আমার গান শুনে আমাকে গানে বদলি করা হয়। অষ্টম শ্রেণিতে থাকতে আমি সিলেটের একটা ব্যান্ডের ভোকালিস্ট ছিলাম। সেটার নাম ছিল সমস্বর। এইতো এভাবেই গানের জগতে আসা। 
কোন গানের মাধ্যমে আপনি বেশি পরিচিতি লাভ করেছিলেন বলে মনে করেন?

শুভ্র দেব: অনেক গান অনেক সময়ে হিট করেছে। যেমন: হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। আবার এক এক জনের কাছে এক এক গান ভালো লাগে। আসলে এক এক সময়ে এক এক গান হিট করেছে। এভাবে নির্দিষ্টভাবে কোনোটা বলতে পারব না।

এক একটা গানের পিছনে এক একটা গল্প থাকে। এরকম গানের কোনো গল্প...?

শুভ্র দেব: আমি তো গান করি প্রায় ত্রিশ বছর ধরে। ছাত্র থাকা অবস্থাতেই বেশ পরিচিতি পেয়ে যাই। গানের আসলে অনেক ধরনের গল্প আছে তা ঠিক। সব গল্প ঐভাবে মনেও থাকে না। একটাই বলি। সেটা হচ্ছে, ‘ভুলিতে পারি না, তারে ভোলা যায় না।’ এটা আমার লেখা এবং আমার সুর করা। এটার কাহিনীটা এমন যে, আমি একবার ঢাকার গাউসিয়াতে একটা সিডির দোকানে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সেই সময় এই গানের লাইনগুলো মনে আসে। আমার কাছে তখন ছোট একটা রেকর্ডার ছিল, সেটাতে রেকর্ড করলাম। এরপর বাসায় গিয়ে সেটা ভালভাবে রেকর্ড করলাম। এই গানটাই পরে শাকিলা জাফর গেয়েছিলেন। পরে ভারতেও রেকর্ড করা হয়েছিল। এই গানটা যে পরে এতো জনপ্রিয়তা পাবে এটা চিন্তাও করিনি।

অনেকেই আপনাকে এখনো স্টাইল আইকন মনে করেন। এই ব্যাপারটা আপনার কাছে কেমন লাগে?

শুভ্র দেব: আমার কাছে যে ব্যাপারটা ভাল লাগে সেটা হচ্ছে, এখনো যারা স্টুডেন্ট, তারাও আমার গান পছন্দ করে। হয়তো রেফারেন্স দেয় যে, আমার বড় আপু বা আমার বড় খালা পছন্দ করত। কিন্তু ওরাও পছন্দ করে। আমার কাছে আসলে মনে হয় কি, আমি ভাল কাজ করতে চেষ্টা করেছি। আর ভাল কাজ করলে অনেকদিন টিকে থাকা যায়।

আজকের দিনে শিল্পীরা এভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। এটার কারণ আপনার মতে কী?

শুভ্র দেব: এখন আসলে শর্ট টাইমে অনেকে উঠে আসার চেষ্টা করে। আর দেখা যায়, ইউটিউবে একটু খরচ করলে অনেক ভিউয়ার হয়ে যায়। ইউটিউবে যদি কেউ ৫,০০০ ডলার খরচ করে তাহলে ১০ লাখ ভিউয়ার হয়ে যায়। এটার মধ্যে তো কোনো ক্রেডিট নেই। আমি মনে করি এখানে ক্রেডিট হচ্ছে, তোমার গান কতদিন টিকে থাকল। এখন কেউ একটা গান শুনে সেটাতে দুই লাইন রবীন্দ্রনাথ, দুই লাইন নজরুল দিয়ে নকল করলে তো হবে না। এখন যারা গানের কম্পোজ করছেন, তাদের মধ্যে খুব কম আছেন যারা নিজেরাই সুর করেন। সবই হচ্ছে কিছু নেওয়া, কিছু নকল, কিছু নিজের। আগে কিন্তু কাজ এমন হতো না। আমরা যেভাবে কজ করেছি তাতে একটা গান নিয়ে অনেকদিন গবেষণা করেছি, কম্পোজ করেছি, তারপর গান বের করেছি।

খেলার থিম সং প্রথম আপনার ছিল। এটার অনুভূতি নিয়ে যদি বলতেন?

শুভ্র দেব: হুম, ১৯৯৮ সালের মিনি ওয়ার্ল্ডকাপের থিম সং আমার করা ছিল। তখন বাংলাদেশ কিন্তু ওভাবে খেলত না, বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন। আর সে সময় বাংলাদেশে এত বেশি খেলাও হতো না। প্রথম বাংলাদেশে মিনি বিশ্বকাপ ক্রিকেট হয় এবং আমি থিম সং করার সুযোগ পাই। এটা আমার জন্য একটা বিশাল অর্জন ছিল। ইএসপিএন এবং স্টারস্পোর্টসে এই গানটা দেখায় এবং ফাইনাল ম্যাচ সাউথ আফ্রিকা বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেষ বলটা যখন হলো তখন আমার থিম সং লাইভ প্রচার করা হয়েছে এবং ১৬৮ টি দেশে এই গান দেখানো হয়। এটা আমার কাছে একটা বড় অর্জন।

মাইকেল জ্যাকসনের সাথে দেখা করার অভিজ্ঞতা আপনার আছে। কেমন ছিল সেই অনুভূতি?

শুভ্র দেব: ১৯৯৩ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০ টার দিকে আমার সাথে দেখা হয়েছিল মাইকেল জ্যাকসনের। মাইকেল জ্যাকসন ঐসময় ওয়াকস মিউজিয়ামের একটা ডেমন্সট্রেশনে এসেছিলেন। সে বছর তিনি ‘মোস্ট পপুলার আর্টিস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছিলেন।

দেশের বাইরে যখন কোনো প্রোগ্রাম করেন তখন কেমন সাড়া পান?

শুভ্র দেব: বাইরের কনসার্টে দর্শকদের সাড়া অনেক বেশি পাওয়া যায়। এদেশের মানুষও আমাকে পছন্দ করে। তবে বিদেশের মানুষরা একটু বেশি নস্টালজিক হয়ে যান দেশের গানের শুনে। দেশের গানের প্রতি তাদের একটা মায়া আছে।

নিজের প্রিয় গান কোনটি?

শুভ্র দেব: নিজের প্রিয় গান হচ্ছে আমার প্রথম অ্যালবামের একটা গান- ‘সাঝের রঙ্গে রঙ্গিন আকাশ।’ পরবর্তীকালে আরেকটা গেয়েছিলাম- ‘আমি মানুষ চিনেছি, তোমায় চিনতে পারিনি।’

এদেশে বর্তমান শিল্পীদের মধ্যে কার কার গান আপনার ভাল লাগে?

শুভ্র দেব: এখন আমার আসলে ওভাবে সবার গান শোনা হয় না। তবে এখনকার শিল্পীদের মধ্যে ন্যান্সি খুব ভাল গান গায়।

পেপসির বিজ্ঞাপনের জন্য যে মনোনীত হয়েছিলেন, এটা নিয়ে যদি একটু বলতেন?

শুভ্র দেব: ১৯৯৪ সালে সাউথ ইস্ট এশিয়াতে একটা জরিপ হয়েছিল। সেই জরিপে বোম্বে থেকে আমির খান প্রথম হন, বাংলাদেশ থেকে আমি এবং পাকিস্তান থেকে আওয়াজ ব্যান্ডের হারুন প্রথম হন। এক এক দেশের জনপ্রিয়তার অবস্থান নির্ণয়ের জন্য এই জরিপ চালানো হয়। পরে আমরাই পেপসির বিজ্ঞাপন করেছিলাম।

এরপর আর কোনো বিজ্ঞাপনে আপনি কী কাজ করেছিলেন?

শুভ্র দেব: না। এরপর আর কোনো বিজ্ঞাপনে আমার আর কাজ করা হয়নি।

খ্যাতির বিড়ম্বনার গল্প কিছু জানতে চাই।

শুভ্র দেব: জনপ্রিয়তা হলে বিড়ম্বনা হবে। এটা মেনে নিতে হবে। যেমন; একবার খুলনায় হোটেলে আমাকে দেখার জন্য লোকজন গেট ভেঙ্গে ফেলছিল। এরপর একবার আমরা চাঁদপুরে প্রোগ্রাম করতে গিয়েছিলাম। সেখানে ২ টা প্রোগ্রাম ছিল। একটা ছেলেদের পলিটিক্যাল গ্রুপের প্রোগ্রাম ছিল যেটায় আমার যাওয়ার কথা। আরেকটা মেয়েদের প্রোগ্রাম ছিল। তো মেয়েরা চাইছিল যে তাদের প্রোগ্রামটাতেও আমি যাই। এজন্য তারা সার্কিট হাউজে এসে ছেলেদের সাথে আলাপ করেছিল কিন্তু তারা রাজি হচ্ছিল না। পরে আমাদের মাইক্রোবাস তাদের হলের সামনে প্রায় জোর করেই ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। এরকম অনেক ঘটনা আছে।

পারিবারিক জীবন কেমন যাচ্ছে?

শুভ্র দেব: পারিবারিক জীবন এইতো- আমি ম্যারিড। আমার স্ত্রী টুম্পা দেব। আমার একটা ছেলে শ্রেয়ান দেব। ও ক্লাস থ্রিতে পড়ে।

আর আমার বাবা মা দুজনেই মারা গেছেন। মা ২০১৩- তে মারা গেলেন আর বাবা গত বছর আমেরিকাতে মারা গেলেন। তারা গত ১২ বছর যাবৎ আমেরিকাতেই থাকতেন।

আর আমার চার বোন আছে। দুই বোন আমেরিকা থাকেন, একজন দুবাইতে, আরেকজন কানাডাতে থাকেন এখন।

আপনার ছেলে কী গানে আসবে?

শুভ্র দেব: না। সে এসবে আগ্রহী না। খেলাধুলা করে, ক্রিকেট পছন্দ করে। তাই ক্রিকেটের ক্লাবগুলোতে নিয়ে যাই। সে তাদের ব্যাপারগুলো নিয়েই আগ্রহী।

কেউ যদি চায় যে আমার ছেলেটাও শুভ্র দেবের মতো হোক, তার মতো গান শিখুক, তাহলে আপনার সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবে?

শুভ্র দেব: আমি তো গায়ক, টিচার না। শেখানোর মতো আমি সময় দিতে পারব না। গায়ক আর গানের টিচার আসলে আলাদা।

ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।



Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.