সর্বশেষ সংবাদ

নক্ষত্রের আলোয়: Subarna Mustafa

দশকের পর দশক কয়েক প্রজন্মের প্রিয় অভিনেত্রী হয়ে থাকার বিরল কৃতিত্ব শুধু  Subarna Mustafa এর। অভিনয়ের জন্য ভালোবাসা, আন্তরিকতাই তাকে আজকের অবস্থানে তুলে এনেছে। শুধু অভিনয় নয়;আবৃত্তিতেও দারুণ এই অভিনেত্রী। 

নক্ষত্রের আলোয়: Subarna Mustafa

জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসেন নন্দিত অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা। প্রতিমুহূর্তে জীবনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন তিনি। অভিনয় দিয়েই লাখো বাঙালির হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী। নিজেই যেন নিজের তুলনা। কি নাটক, কি সিনেমা- সবখানেই তার সমান পদচারণা। যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। তার চলনে-বলনে, হাসি-কান্নায় রয়েছে স্বকীয়তা। তিনি সবসময় 'বুঝে অভিনয় করেন'। আর সে কারণে তার অভিনয় স্বাভাবিক; অতি অভিনয়ে দুষ্ট নয়। অভিনয়ের সময় সুবর্ণা মুস্তাফার অভিব্যক্তি ক্ষণে ক্ষণে বদলায়; না বলা কথা তার অভিনয়ে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে তার চোখের অভিব্যক্তি। অনেক প্রবীণ বা একেবারেই নবীন সহশিল্পীদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা ও ক্ষমতা তাকে করেছে অতুলনীয়। শুটিংয়ের সময় সুবর্ণা শুধু নিজেই অভিনয় করেন না, নানা সহযোগিতায় সহশিল্পীদের অভিনয়ও উজ্জ্বল করে তোলেন। নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের কাছে সুবর্ণা মুস্তাফা একটি স্বপ্নের নাম। সম্প্রতি উত্তরায় তার নিজ বাসায় নন্দনের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিলেন এই অভিনেত্রী। বদরুল আনাম সৌদের পরিচালনায় 'গহীন বালুচর' চলচ্চিত্র নিয়েই আলাপন শুরু হলো। তিনি বলেন, 'গহীন বালুচর' ছবির গল্পভাবনা থেকে শুরু করে চিত্রনাট্য তৈরি, অনুদানের জন্য জমা থেকে শুরু করে সব প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। যে কারণে অন্য আট-দশটা ছবি থেকে এই ছবিতে কাজের অনুভূতি আলাদা। এটি গ্রামীণ পটভূমির ওপর নির্মিত প্রেমের ছবি। বিয়োগান্তক প্রেমের গল্প। এখানে চর একটা ব্যাকড্রপ হিসেবে কাজ করেছে। ছবিটি পৃথিবীর যে দেশেই বসে দেখা হোক না কেন, দেখলেই বোঝা যাবে এটা বাংলাদেশের ছবি। গ্রামবাংলার ছবি। এই গ্রামই সবসময় আমাদের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করে। ছবিতে আরও দেখানো হয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের। ছবির মূল উপজীব্য হলো, প্রকৃতি কীভাবে মানুষের জীবনকে প্রণোদিত করে, তাই দেখানো হয়েছে। ছবির প্রায় সব কাজ শেষ হয়েছে। খুব শিগগির সেন্সর বোর্ডে জমা পড়বে। ছবিটি নিয়ে আমার প্রত্যাশা অনেক।' এ ছবিতে নতুন তিনজন অভিনয়শিল্পী অভিনয় করেছেন। তারা কেমন করেছেন? 'নতুন ছেলেমেয়েদের ব্যাপারটা কিন্তু একেবারেই আলাদা। তারা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। আমার বিশ্বাস, এই ছেলেমেয়েদের অভিনয় দর্শকদের ভালো লাগবে।'

সুবর্ণা মুস্তাফার দাদার বাড়ি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নে। শক্তিমান অভিনেতা ও আবৃত্তিকার গোলাম মুস্তাফা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন মেয়ে সুবর্ণার বাবার জন্মভিটা দেখার সময়-সুযোগ হয়নি। বাবা মারা যাওয়ার চৌদ্দ বছর পর 'গহীন বালুচর' ছবির শুটিংয়ে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। দাদার বাড়ির লোকেরা ভালোবেসে সুবর্ণা মুস্তাফার নতুন নাম দিয়েছে। তা হলো মোল্লার ঝি। যেহেতু দপদপিয়ার মেয়ে সুবর্ণা মুস্তাফা। তাই সেখানকার লোকেরা বদরুল আনাম সৌদকে 'জামাই' বলে সম্বোধন করেন। প্রত্যেকেই জামাই আদরও করেছিল। 

পরিচালক বদরুল আনাম সৌদ কেমন করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সৌদের গল্পের একটা বৈশিষ্ট্য থাকে। তা হলো, ওর গল্পের সবচেয়ে বড় চরিত্র এবং সবচেয়ে ছোট চরিত্র যাই হোক না কেন, প্রতিটি চরিত্রই পূর্ণাঙ্গ। 'গহীন বালুচর' ছবিতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আর টেলিভিশনে সৌদের নাটকগুলো যদি মনোযোগ দিয়ে দেখি তাহলে ওর গল্প বলার ধরনটা আলাদা বলতে হবে। ও নাটকের অনেক জায়গায় সিনেমাটিক বলে মনে হয়। আমার বিশ্বাস, সৌদ টেলিভিশনের মতো সিনেমায়ও তার জাদু দেখাতে পারবে।'

আমাদের সিনেমার দর্শক দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। আমাদের দুর্বলতা আসলে কোথায়? সুবর্ণা মুস্তাফা বলেন, 'জুড়ি বোর্ডের কারণে এখনকার সময়ের অনেক ছবি দেখার সুযোগ হয়েছে। ছবিগুলোয় যে ঘটনা দেখানো হচ্ছে তা ঢাকার ঘটনা হতে পারে, আবার সিঙ্গাপুরের ঘটনাও হতে পারে। ঘটনা নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। প্রতিটি ছবিতেই আমাদের দেশকে খুব একটা দেখা যায় না। সাম্প্রতিক কালে যেটা দেখা গেছে 'অজ্ঞাতনামা' আর 'আয়নাবাজি'র ক্ষেত্রে। আরও একটি বিষয় হলো ছবির নায়ক কিন্তু গল্প। গল্প ভালো হলে দর্শকরা ছবি দেখবেন, এটা আমি বিশ্বাস করি।'

শুধু অভিনয়েই নয়, ধারাভাষ্যকার হিসেবেও সুবর্ণা এখন জনপ্রিয়। রেডিও ভূমিতে তার ক্রিকেট ধারাভাষ্য বেশ প্রশংসিত। তাকে নিয়মিত ধারাভাষ্যকার হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, 'ধারাভ্যষ্য নিয়ে আমি অনেক সাড়া পাচ্ছি। বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে সিরিজের সময় কোনো এক কাজে নেপাল যাচ্ছিলাম। তখন দুটো খেলা হয়েছিল আর বাকি ছিল দুটো খেলা। তখন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন এক অফিসার আমায় বললেন, ক্যাপ্টেন আপনি চলে যাচ্ছেন খেলা তো এখনও আছে। ক্যাপ্টেন চলে গেলে কী করে হবে? তখন আমি বললাম, 'খেলা তো চলবে। আমি না থাকলেও আমাদের ছেলেরা ভালো করবে।' আর ক'দিন পর সুর্বণা ব্যস্ত হয়ে উঠবেন ঈদের নাটক ও টেলিছবির কাজ নিয়ে। তিনি বলেন, 'সংখ্যার চেয়ে কাজের মানই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনই নানা কাজের প্রস্তাব পাই, কিন্তু সব পছন্দ হয় না বলে কাজ করি না।'

বাংলাদেশে দশকের পর দশক ধরে কয়েক প্রজন্মের প্রিয় অভিনেত্রী হয়ে থাকার বিরল কৃতিত্ব শুধু সুবর্ণা মুস্তাফার। অভিনয়ই শুধু নয়, আবৃত্তিতে দারুণ। অভিনয়ের মতো আবৃত্তিতেও বাবা গোলাম মুস্তাফাই তার প্রথম গুরু। নিতান্তই আবেগের বশে যে কলা তিনি শিখতে শুরু করেন অল্পদিনের মধ্যেই সেই আবৃত্তি তার সবচেয়ে প্রিয় শখ হয়ে ওঠে। জন্মগতভাবেই সুর্বণা বেড়ে উঠেছেন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। ছোটবেলা থেকেই নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছিল তার প্রবল আগ্রহ। ভিকারুননিসা নূন স্কুল আর হলি ক্রস কলেজে পড়ার সময় তিনি ছিলেন এসব কাজে সবার সেরা। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন, ততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন টিভি নাটকের পরিচিত মুখ। তারও আগে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন মঞ্চে। মূলত সত্তর দশকের শেষের দিকে তিনি অভিনয়ে নিয়মিত হয়ে ওঠেন। আর ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে জাদুর মতো টানতে শুরু করেন এদেশের সর্বস্তরের টিভি দর্শককে। 'বরফ গলা নদী', 'হাজার বছর ধরে', 'পারলে না রুমকি', থেকে শুরু করে 'আজ রবিবার', 'কোথাও কেউ নেই' সহ অসংখ্য টিভি নাটক দিয়ে তিনি জয় করেছেন দর্শকহৃদয়। একবাক্যে বলতে গেলে- টেলিভিশনের এক এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেত্রী আজও সুবর্ণা মুস্তাফা।



Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.