সর্বশেষ সংবাদ

ক্যানসারজয়ী ‘Hurrem’


বাংলাদেশের অনেক দর্শকের পছন্দের ধারাবাহিক ‘সুলতান সুলেমান’। বাংলায় ডাবিং করা দীপ্ত টিভির এই ধারাবাহিকের জনপ্রিয় চরিত্র ‘Hurrem সুলতান’। সুলেমানের সমান্তরালে এগিয়েছে Hurrem-র জীবনের গল্প। পর্দায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দর্শকদের কাছ থেকে আজ রোববার বিদায় নিচ্ছেন Hurrem।


ধারাবাহিকটি তুরস্কের ৬০০ বছরের অটোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম সফল শাসক সুলতান সুলেমানকে নিয়ে বানানো। এই শাসকের জীবনে এসেছেন অনেক নারী। তবে সবাইকে ছাপিয়ে ইতিহাসে ঠাঁই করে নেন Hurrem সুলতান। সাধারণ দাসী থেকে সুলতানের প্রিয়তম স্ত্রী হয়ে ওঠেন তিনি। সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা আর প্রাসাদ ষড়যন্ত্র দিয়ে ক্ষমতার সর্বোচ্চটুকু নিজের করে নেওয়া এক রহস্যময়ী নারী।

প্রথমে Hurrem-র চরিত্রে অভিনয় করেন তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান অভিনেত্রী মারিয়েম জারলি। প্রথম থেকে পঞ্চম মৌসুম পর্যন্ত তিনিই ছিলেন Hurrem সুলতান। ১৯৮৩ সালের ১২ আগস্ট জার্মানিতে জন্ম নেওয়া মারিয়েম বেড়ে উঠেছেন সেখানেই। অভিনয় আর মডেলিং করে নাম করছিলেন তিনি।

এরই সুবাদে তিনি ‘সুলতান সুলেমান’ ধারাবাহিকের পরিচালক-প্রযোজকের নজরে পড়েন। তাঁরা ঠিক এমন একটি সৌন্দর্য আর রহস্যঘেরা মুখের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন; যিনি পর্দা ছাপিয়ে ঢুকে যাবেন দর্শকের মনে। নিরাশ করেননি তিনি।

২০১১ সাল থেকে এই ধারাবাহিকের শুটিং শুরু হয়। জার্মানি থেকে তুরস্কে গিয়ে মারিয়েম ওঠেন এক হোটেলে। এখানে থেকেই ২০১৩ সালের মে মাস পর্যন্ত তিনি শুটিং চালিয়ে যান। তারপর হুট করে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা না দিয়েই শুটিং বন্ধ করে দেন। চলে যান জার্মানিতে। নানা গুজবের মধ্যে তুরস্কের পত্রিকা ‘হুরিয়েত’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তুরস্কের প্লেবয় চান এতেশের প্রেমে পড়েছিলেন তিনি।

অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তিনি তাঁকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক চান উল্টো গর্ভপাত করাতে বলেন। এটা শুনে প্রচণ্ড আঘাত পান তিনি। সিদ্ধান্ত নেন, সব ছেড়েছুড়ে জার্মানি চলে যাবেন। একাই সন্তানকে পৃথিবীতে স্বাগত জানাবেন। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী এ অভিনেত্রী ফুটফুটে এক মেয়ের মা।

মারিয়েম চলে যাওয়ায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো দশা হয় পরিচালক-প্রযোজকের। অভিনেত্রী ভাহিদে পারচিনকে Hurrem চরিত্রে বাছাই করে সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পান তাঁরা। তবে সিদ্ধান্তটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ, Hurrem চরিত্রে ভাহিদেকে মানতে পারছিলেন না অনেকে।

তাঁরা সিদ্ধান্ত বদল করে মারিয়েমকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ফোরামে। স্বভাবতই ধারাবাহিকের ষষ্ঠ মৌসুমে নতুন Hurrem-কে দর্শকেরা কীভাবে নেবেন, তা তাদের ভাবনায় ফেলেছিল। তবে তাদের সে ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে দর্শকের ভালোবাসা আদায় করে নেন ভাহিদে পারচিন।

ভাহিদের জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৩ জুন, তুরস্কের রুমেলিয়ায়। বাবা ছিলেন ট্রাকচালক, মা গৃহিণী। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে অর্থনীতিতে স্নাতক পড়তে শুরু করেন। তবে মন দেন অভিনয়ে। পরে অর্থনীতি পড়া বাদ দিয়ে ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে। 
সেরা ফলাফল নিয়ে পাস করেন তিনি। চলে যান আঙ্কারায়। পরে রাষ্ট্রীয় থিয়েটারের হয়ে কাজ করেন। ২০০৩ সালে ভাহিদে টেলিভিশন নাটকে অভিনয় শুরু করেন। এর তিন বছর পর চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। ‘Hurrem সুলতান’ চরিত্রে অভিনয় শুরুর আগেই তিনি টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হন।

ভাহিদে পারচিন ১৯৯১ সালে অভিনেতা আলতান গুরদুমকে বিয়ে করেন। তখন তাঁর নাম হয় ভাহিদে গুরদুম। ১৯৯৪ সালে ভাহিদে-আলতান দম্পতির ঘর আলো করে আসে তাদের একমাত্র সন্তান আলিজে। ২০১১ সালে তাঁর স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসা শেষে সেরে ওঠেন তিনি।

তবে এর দুই বছর পর ভেঙে যায় তাদের দীর্ঘ ২২ বছরের সংসার। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা, এত দিনের সংসারে ভাঙন—সব কষ্টের অনুভূতি নিয়ে তিনি যেন মিশে যান Hurrem-র সঙ্গে। পর্দার Hurrem-র জীবনেও যে তখন টানাপোড়েন চলছিল!

‘সুলতান সুলেমান’ ধারাবাহিকে দেখা যায়, ভাহিদে যখন Hurrem সুলতান চরিত্রে অভিনয় শুরু করলেন, তখন সুলেমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। দাম্পত্যে একটা দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। রাগ আর অভিমানের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে গভীর প্রেমটুকু। 
একটা সময় সুলতান সুলেমান যখন জানতে পারেন, Hurrem নিরাময় অযোগ্য কঠিন রোগে আক্রান্ত; তখন পুরোনো প্রেম জেগে ওঠে তাঁর মনে। সব কালো মেঘ সরিয়ে দিয়ে গভীর প্রেমে আচ্ছন্ন হন দুজনেই। পরম ভালোবাসার সুলতানের কোলে মাথা রেখে পৃথিবীর মায়া ছাড়েন Hurrem।

তবে বাস্তবে ভাহিদের ভাগ্যে এমনটা হয়নি। ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের সঙ্গে লড়াই করে জিতে যান তিনি। কিন্তু হারিয়ে ফেলেন এত দিনের ভালোবাসার মানুষটিকে। ফলাফল, বিয়ে-বিচ্ছেদ। কেন বা কী কারণে তাঁর জীবনে এমনটা হয়েছিল, তা নিয়ে তিনি মুখ খোলেননি। তবে জীবনের এমন অভিজ্ঞতা যে পর্দায় তাঁকে নিখুঁত অভিনয় করতে, চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেতে সহায়তা করেছিল; তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Hurrem চরিত্রটাকে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। বারবার বলছিলেন, ‘একটা মিশন শেষ করার কাজ পেয়ে খুবই আপ্লুত আমি।’ মিশনটা সফলভাবেই শেষ করেছেন তিনি। তরুণী মারিয়েমের চেয়ে কোনো অংশে কম যাননি ৫২ বছর বয়সী ভাহিদে। ক্যানসারজয়ী ভাহিদে জয় করেছেন দর্শক-হৃদয়ও।
Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.